ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

বাংলামুলুকে আমলাতন্ত্রের ক্রমধারা


আমাদের এ বাংলা ভূখণ্ডটি যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অধীন ছিল তখন লক্ষ লক্ষ ব্রিটিশ সুদূর ইউরোপ থেকে এসে আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করেনি; খুবই স্বল্প সংখ্যক ব্রিটিশ সে দেশ থেকে আমাদের দেশে এসে, অবস্থান করে আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। ভিন দেশ থেকে আসা স্বল্প সংখ্যক মানুষ দিয়ে ভিন্ন সংস্কৃতির ঘনবসতিপূর্ণ ও জন অধ্যুষিত একটি ভূখণ্ড শাসন করা মোটেও সহজ কাজ নয়। ব্রিটিশদের জন্য এ ভূখণ্ড শাসনের পরিবেশটিও খুব অনুকূল ছিল না। ভূখণ্ডের মানুষ সঙ্গত কারণেই তাদেরকে ভালভাবে গ্রহণ করেনি। সুতরাং অনেকটা বৈরি পরিবেশের মধ্যেই তাদেরকে অধিকৃত ভূখণ্ডটি শাসন করতে হয়েছে। এ ভূখণ্ডের প্রকৃতি হচ্ছে নানা ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের সহাবস্থান; সেটিও ভূখণ্ড শাসনের ক্ষেত্রে অনুকূল ছিল না।

ভূখণ্ড শাসনের প্রতিকুল ও বৈরী বিষয়সমূহকে আমলে নিয়েই ব্রিটিশরা আমাদেরকে দুইশত বৎসর শাসন করে গেছে। এ শাসনের জন্য তারা যে পন্থাটিকে আদর্শ হিসেবে প্রয়োগ করেছে সেটি হলো দমন ও নিয়ন্ত্রণমূলক শাসন ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থাপনার মূল বিষয়টিই ছিল ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রিকতা অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের পুরো বিষয়টিকে সুনিয়ন্ত্রিত একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে গণ্ডীবদ্ধ রেখে শাসন করা। ঐ গণ্ডীর কেন্দ্রে কয়েকজন নিয়ন্ত্রককে এমনভাবে ক্ষমতা দিয়ে বসিয়ে রাখা যাদের অনুমোদন ছাড়া গাছের পাতা নড়ানোও সম্ভব নয়। এরকম দমন ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাপনার কঠিন প্রয়োগের মাধ্যমেই স্বল্প সংখ্যক ব্রিটিশ এ ভূখণ্ডে এসে এ ভূখণ্ডের মানবগোষ্ঠীকে দীর্ঘ সময়ব্যাপী শাসন করে গেছে।

এটি স্বতঃসিদ্ধ যে, ‘শাসন’ শব্দটির সাথে ‘নিয়ন্ত্রণ’ ও ‘দমন’ দুটি বিষয়েরই শক্ত যোগ আছে এবং প্রায়োগিকভাবেও তা কার্যকর। সমন্বিত শাসন ব্যবস্থাপনার প্রচলিত নাম ‘প্রশাসন’ এবং এর দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিকে বলা হয় ‘প্রশাসক’। ‘শাসন’ এবং ‘প্রশাসন’ শব্দ দুটি সম্পূরক, একইভাবে ‘প্রশাসন’ এবং ‘প্রশাসক’ও সম্পূরক । প্রায়োগিকভাবে দৃশ্যমান এ শব্দগুলির সাথে যুক্ত ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গকেই বহুল আলোচিত ভাষায় বলা হয়, ‘আমলা’ এবং আমলা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত শাসন ব্যবস্থাপনাটিকেই বলা হয়, ‘আমলাতন্ত্র’। অর্থাৎ আমলা হলো সনাতন দমনমূলক শাসন পদ্ধতিরসাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত একটি ক্ষমতাবান পদবী।

দমন ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাপনার জন্য যে ‘প্রশাসন’ তারচেয়ে গ্রহণযোগ্য, স্বাধীন, কার্যকরী, উৎপাদনশীল এবং অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনাই হলো ‘পরিচালনা’। ‘দেশ শাসন করা’ এবং ‘দেশ পরিচালনা করা’- দুটি বিষয় এক নয়। প্রথমটি আমলাতান্ত্রিক যা অংশগ্রহণমূলক ও জন-বন্ধুত্বপূর্ণ নয়, পরেরটি গণতান্ত্রিক এবং অংশগ্রহণমূলক ও জন-বন্ধুত্বপূর্ণ । তৃণমূল থেকে দেশের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পর্যন্ত সকল বিষয়-আশয়, সিদ্ধান্তগ্রহণ, বাস্তবায়ন যেখানে নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়, সেটিই হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা যা জনগণকে ‘শাসন করে’।

অন্যদিকে পুরো ব্যবস্থাপনাকে অংশগ্রহণমূলক করে, সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য তাকে প্রয়োজনীয় বিভাজনে বিভাজিত করে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ভিত্তিক মেধাবীদের কাছে দায়িত্ব অর্পণ এবং তার যথাযথ সমন্বয় ব্যবস্থাপনাটিকে আরও গতিশীল করে; এটি হচ্ছে ব্যবস্থাপনা ‘পরিচালনা’ করা। স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালকের কার্যালয়ের কাজকে সেক্টর ভিত্তিক করে পরিচালনা করা এর একটি বড় উদাহরণ। স্বাস্থ্য মহাপরিচালক না বলে এটিকে স্বাস্থ্য মহা-প্রশাসকও বলা যেতে পারত, সেটি বলা হয়নি। কখনও প্রশাসন ক্যাডারের কোন মানুষ এটির দায়িত্ব পেলে তখন হয়ত এর নাম স্বাস্থ্য মহা-প্রশাসক হলেও হতে পারে।

ব্রিটিশ শাসনামলে রবার্ট ক্লাইভ, ওয়ারেন হেস্টিং ও পরবর্তীতে লর্ড কর্নওয়ালিস এবং তাদের ঘনিষ্ঠজনেরা ভারতবর্ষ পরিচালনার সুবিধার্থে এক বিশেষ প্রশাসন ব্যবস্থা বা আমলাতন্ত্র তৈরি করেন যেখানে শুধুমাত্র ইউরোপীয়রাই অংশগ্রহণ করতে পারতো। লর্ড কর্নওয়ালিস বিশ্বাস করতেন, স্থানীয়রা খুবই অবিশ্বাসী এবং দুর্নীতিগ্রস্থ, বিধায় তাদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকার বা আমলা হবার কোন অধিকার নেই। একারণে, আমলা হবার বিষয়টি শুধু শ্বেতাঙ্গদের জন্যই সংরক্ষিত ছিল।

১৮৫০ সালে টি. বি ম্যাকলের সুপারিশে প্রথমবারের মতো নেটিভ ইন্ডিয়ানদেরকে আইসিএস বা ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। নেটিভদের জন্য এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা তখন অনেক কঠিন ছিল। পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো লন্ডনে। সাদা চামড়ার মানুষদের সাথে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পাস করার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র তথা সিভিল সার্ভিসে প্রবেশের সুযোগ দেয়া হতো। ফলে নেটিভদের জন্য উন্মুক্ত করে দিলেও আইসিএস বা ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাওয়ার ব্যাপারটা মোটেও সহজ ছিল না। বহু অর্থ খরচ করে বিলেতে গিয়ে ইংরেজি ও ইউরোপীয় ভাষা সাহিত্য, ইতিহাস নিয়ে ব্রিটিশদের সাথে প্রতিযোগিতা করে সুযোগ পাওয়া ছিল কঠিন। যার ফলে আইসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ উন্মুক্ত করার পরবর্তী চৌদ্দ বছরে শুধু মাত্র একজন নেটিভ আইসিএস হতে পেরেছিল। তিনি ছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

আমলাতন্ত্রের ইতিহাস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে জানা যায় যে, রাষ্ট্রব্যবস্থার সেই প্রাচীনকাল থেকেই প্রজাদের উপর ছড়ি ঘোরানোর উদ্দেশ্যে সমাজের উচ্চবিত্তদের মধ্য থেকে একটি নিয়ন্ত্রক গোষ্ঠী তৈরি করা হতো এবং তাদের মধ্যে সুপরিকল্পিতভাবে সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্স ঢুকিয়ে দিয়ে তাদেরকে দাম্ভিক করে গড়ে তোলা হতো। এদেরকে সম্ভাব্য সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতা দিয়ে অন্য সকলের থেকে পৃথক করে একটি এলিট শ্রেণি গঠন করা হতো। ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেওয়া হয় এই শ্রেণিকে। এরাই হচ্ছে আমলা। প্রাচীন রোমান আমলেও এরা ছিলো। একটা সময় পর্যন্ত সেনা প্রশিক্ষণ ছাড়া কেউ আমলা হতে পারত না। বহুকাল পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য এই শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উন্মুক্ত ছিল না।

আইসিএস পরীক্ষায় টিকে যাবার পরেও নেটিভদেরকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই বছর পড়াশুনা ও প্রশিক্ষণ নিতে হতো, এর পরে তারা শিক্ষণবীশ অফিসার থেকে আইসিএস অফিসার হতে পারতেন। তারা কখনও প্রশাসনের উচ্চপদ পেতেন না, প্রশাসনের উচ্চপদ ব্রিটিশদের জন্যেই সংরক্ষিত ছিল। এই আইসিএস অফিসারদের তৎকালীন সময়ে বলা হত ‘স্বর্গীয় সন্তান’, এবং তাদের ক্ষমতার সুপিরিওরিটি সেভাবেই দেয়া হতো।

আজকের স্বাধীন বাংলাদেশেও বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকুরীতে জয়েন করার পরে যে ফাউন্ডেশন ট্রেনিং হয়, সেখানে প্রশাসন ক্যাডারের প্রশিক্ষণের সময়ে তাদের মাথায় একইভাবে ক্ষমতার সুপিরিওরিটি ও তা চর্চার বিষয়টিকে ভালভাবেই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। প্রশাসন ক্যাডারের একজন তরুণ চাকুরীজীবীও নিজেকে অনেক ক্ষমতাবান এবং উপরের একজন ভাবতে পারেন। তিনি যে শাসক এবং বাকিরা সবাই প্রজা এ ধারণাটি তিনি প্রথমেই পেয়েজান।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া নিপীড়নমূলক জনপ্রশাসনই বহাল থাকে। দেশভাগের পর সিভিল সার্ভিসের ভারত অংশে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস থাকলেও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে করা হয় সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান (সিএসপি)। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস আমলাতন্ত্রের এলিটদেরই প্রতিনিধিত্ব করত এবং পশ্চিম পাকিস্তানিরাই তা দখলে রেখেছিলো । মহকুমা, জেলা ও সচিবালয়ের সর্বোচ্চ পদগুলোতে তারাই নিয়োজিত থাকতেন। রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ এবং সামরিক নেতৃত্ব কর্তৃক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের ফলে রাজনীতিকদের ওপর আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্ব ও প্রভাব প্রবলতর হয়।

আমলাদের মনোযোগ পাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী আমলাদের জনগণের ‘মনিব’ হিসেবে আখ্যায়িত করতেন। অথচ ১৯৪৮ সালে জওহরলাল নেহেরু ভারতের আইসিএসদের জনগণের ‘সেবক’ হিসেবে কাজ করার নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের পরবর্তীতে পূর্ববাংলার সচিবালয়ের সমস্ত উচ্চপদগুলি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী এবং ভারত থেকে উদ্বাস্তু অবাঙ্গালী আমলাদের দখলে; স্থানীয় রাজনীতিবিদদের সাথে তাদের ব্যবহার ছিল প্রভুর মত। আমলাদের অধিকারে ছিল পৃষ্ঠপোষকতার সম্পদ। প্রশাসনের সব কিছুকে সাধারণ জনসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ এবং সংরক্ষিত করেছিল তারা।

সরকারে আমলাদের প্রভাব এতটাই ছিলো যে অডিট সার্ভিসের ডাকসাইটে আমলা গুলাম মোহাম্মদ পাকিস্তানের প্রথম অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত হন। একই সার্ভিসের অপর সদস্য চৌধুরী মোহাম্মদ আলী পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের সবচেয়ে প্রভাবশালী সচিব হন। পরবর্তী সময়ে এই আমলাদের জন্য সরকারকে সেক্রেটারি জেনারেলের পদ সৃষ্টি করতে হয়েছিল। যদিও তার অবসরের পর এই পদটি বিলুপ্ত করা হয়েছিল। লিয়াকত আলী খান খুন হওয়ার দু বছর পর ১৯৫৩ সালে গুলাম মোহাম্মদ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল এবং চৌধুরী মোহাম্মদ আলী হয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী।

বাঙ্গালির জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান শুরু থেকেই আমলাতন্ত্রের স্বেচ্ছাচারিতার বিরোধী ছিলেন। তিনি আমলাতন্ত্রকে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার পরিপন্থী বলে মনে করতেন। তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীর একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, “আমরা যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, তারা এই সমস্ত জঘন্য কাজকে ঘৃণা করি। খাজা নাজিমুদ্দিন সাহেব তাঁর মন্ত্রিত্বে একজন সরকারি আমলাকে গ্রহণ করলেন, এরপর আমলাতন্ত্রের প্রকাশ্য খেলা শুরু হলো পাকিস্তানের রাজনীতিতে। একজন সরকারি কর্মচারী হলেন গভর্নর জেনারেল, আরেকজন হলেন অর্থমন্ত্রী। খাজা সাহেব ছিলেন দুর্বল প্রকৃতির লোক। তিনি অনেক গুণের অধিকারী ছিলেন, তবে কর্মক্ষমতা এবং উদ্যোগের অভাব ছিল। ফলে আমলাতন্ত্র মাথা তুলে দাঁড়াল। … আমলাতন্ত্রের জোটের কাছে রাজনীতিবিদরা পরাজিত হতে শুরু করল।”

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে পূর্ব বাংলার হাতে গোনা কয়েকজন আমলা বাদে বাকিদের নানাবিধ কীর্তিকলাপ প্রকাশ পায় মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দলিলে। স্বাধীন, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে সেই পুরনো নিয়ম কানুন আর সেই পুরনো আমলাতন্ত্র দিয়েই প্রশাসন যন্ত্র শুরু হয়। পাকিস্তানের সিএসপি কর্মকর্তাগণই সচিব, যুগ্ম সচিব, প্রধান প্রকৌশলী ইত্যাদি হয়ে বসেন। এই লোকগুলি পাকিস্তানের লাহোরে দুই বছর মেয়াদী বুনিয়াদী প্রশিক্ষণসহ এদেশের মানুষকে শোষণের জন্য উচ্চ পর্যায়ে প্রশিক্ষিত ও পাকিস্তানী দেশ প্রেমের দীক্ষায় দীক্ষিত এবং পরীক্ষিত ছিলেন। ১৯৭১ এর জুলাই-আগস্ট মাসে প্রবাসী সরকার পুরনো ঔপনিবেশিক ধাঁচেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সচিবালয় গঠন করে এবং পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের পূর্ববাংলার আমলারা যারা কলকাতায় পালিয়ে ছিলেন তাদের নিয়েই তৈরি হয় আমলাতান্ত্রিক সংগঠন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশেও আমলাতন্ত্র কিভাবে স্বাধীনতার সমস্ত অর্জন নীরবে খেয়ে যাচ্ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুর দেয়া নানা জনসভায়। ১৯৭৫ সালের ২৬শে মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক জীবনের শেষ জনসভায় বক্তব্যের একটি অংশ ছিল এরকম-

“আমাদের লেখাপড়া শিখায় কে ? আইজ অফিসার বানায় কে ? কার টাকায়? বাংলার দুঃখী জনগণের টাকায়। আপনাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা। শিক্ষিত ভাইরা, এই জনগণ আপনার লেখাপড়ার খরচ দিয়েছে শুধু আপনার সংসার দেখার জন্য নয়। শুধু আপনার ছেলে মেয়ে দেখার জন্য নয়। দিয়েছে, তাদের আপনি কাজ করবেন সেবা করবেন। তাদের আপনি কি দিয়েছেন? কি ফেরত দিচ্ছেন ? কতটুকু দিচ্ছেন ? কার টাকায় অফিসার সাব ? কার টাকায় সচিব সাব ? কার টাকায় মেম্বার সাব ? কার টাকায় সব সাব ? সমাজ যেন ঘুণে ধরে গেছে এই সমাজকে আমি চরম আঘাত করতে চাই।"

বঙ্গবন্ধু সেই ব্রিটিশ ঔরসের পাকিস্তানী স্বৈরাচারী মনোভাবের আমলাতন্ত্রকে সমূলে বিনাশ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন যা সফল করার আগেই চক্রান্তকারীদের হাতে তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়। ১৯৭২ সালের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ সরকার প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য প্রশাসন ও চাকরি পুনর্গঠন নামে একটি কমিটি গঠন করে। ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো এবং বেসামরিক চাকরির পদ্ধতি সম্পর্কে সরকারের নীতি কী হবে সে ব্যাপারে পরামর্শদানের জন্য এ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গঠিত রশিদ কমিশন অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপের সুপারিশ করে। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, রশিদ কমিশন অত্যন্ত আলোচিত এবং সবসময়ের জন্য যুতসই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রস্তাব করে। তা হলো সিনিয়র সার্ভিস পুল (এসএসপি) নামে একটি পৃথক ক্যাডার সৃষ্টি যেখানে উপ-সচিব পর্যায়ে সরকারি কর্ম-কমিশন কর্তৃক পরিচালিত লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিয়োগ প্রদান করা হবে এবং তা সব ক্যাডারের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সিনিয়র সার্ভিস পুলকে (এসএসপি) একটা পৃথক ক্যাডার হিসেবে গঠনের ব্যাপারে সরকার প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন করে এবং ১৯৭৯ সালে সেই বিধি বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করে। তবে এসএসপিতে রিক্রুটমেন্টের জন্য লিখিত পরীক্ষার পাঠ্যসূচি নিয়ে সরকারি কর্ম-কমিশনের সঙ্গে একমত হতে সরকারের দীর্ঘ ১০ বছর সময় লেগে যায়। অনেকে মনে করেন, এই কালক্ষেপণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। ১৯৮৯ সালের ১২ জুলাই এসএসপি বিলুপ্ত হয়ে যায়।

এরশাদ শাসনামলে উপজেলা আদালতের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ’৮৩ সালে ৬৫০ জনের বিশাল একটি ব্যাচ নিয়োগ দেওয়া হয়। এই ব্যাচের কর্মকর্তাদের লিখিত পরীক্ষা ছাড়া শুধুমাত্র এমসিকিউ’র মাধ্যমে নিয়োগ করা হয়। নিয়োগের শর্ত ছিল এরা উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবেই অবসরে যাবেন। কিন্তু রাজনৈতিক তদবিরে এ শর্ত প্রত্যাহার করে এদের সিভিল প্রশাসনের ধারাবাহিকতায় যুক্ত করা হয়। ’৮৩ সালের পর ’৮৪ ব্যাচে ৪৫০ এবং ও ’৮৫ ব্যাচে ৫৫০ জনকে নিয়োগ প্রদান করা হয়। কাছাকাছি সময়ে উপর্যুপরি তিনটি ব্যাচে অধিক লোক নিয়োগের ফলে সিভিল সার্ভিসে অপেক্ষাকৃত দুর্বলরাও প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যান। ওই সময় নির্বাচন অফিসার ও সেনানিবাসের নির্বাহী কর্মকর্তাদেরও সিভিল প্রশাসনে আত্মস্থ করার ফলে প্রশাসন নড়বড়ে হয়ে পড়ে। অন্যদিকে আত্মস্থ হওয়া প্রশিক্ষণবিহীন অফিসারদের পেশাদার মনোবৃত্তির ঘাটতির কারণে প্রশাসন ক্রমান্বয়ে দুর্নীতিপ্রবণ হয়ে পড়ে। চরম নৈতিক অবক্ষয় যুক্ত আমলাতন্ত্র আর আমলাতন্ত্রের আভ্যন্তরীণ সংঘাত- ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থ টানাপড়েন ৯০ উত্তর কোন গণতান্ত্রিক সরকারকে একদিকে কখনই জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব কারী সরকার হয়ে উঠতে দেয় নি ; অপর দিকে জাতিকে বারংবার রাজনৈতিক সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিয়ে জাতীয় অগ্রগতিকে বাঁধা গ্রস্ত করেছে। জনগণ রাজনৈতিক দলের উপর বিক্ষুব্ধ হয়েছে । কিন্তু , অধঃপতনের হোতা আমলাতন্ত্র স্বীয় চরিত্রে স্ব অবস্থানে বহাল তবিয়তে থেকে গেছে।

ক্যাডার সৃষ্টি হওয়ার শুরু থেকে সাবেক সচিবালয় ক্যাডার ও প্রশাসন ক্যাডার সবচেয়ে প্রভাবশালী ক্যাডার হওয়ায় সচিবালয়ে সরকারের সহকারী সচিব থেকে সচিব এবং সমমর্যাদার প্রায় সবকয়টি পদ একচেটিয়া তাদেরই দখলে। প্রকৃচির (প্রকৌশলী, কৃষিবিদ ও চিকিৎসক) আন্দোলনের মুখে সচিবালয়ের এই পদগুলোতে ক্যাডারের অনুপাত অনুযায়ী সিনিয়র সার্ভিস পুল গঠন করে উপ-সচিব থেকে কিছু কিছু করে কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সরকার সিনিয়র সার্ভিস পুল ভেঙে দিয়ে ২০০২ সালে উপ-সচিব থেকে সচিব পর্যায়ে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য বিধিমালা প্রণয়ন করে। সেখানে অন্যান্য ক্যাডারের জন্য উপ-সচিব পদে ২৫% এবং যুগ্ম-সচিব থেকে তদূর্ধ্ব পর্যায়ে ৩০% পদোন্নতির কোটা রাখা হয়। কোটা পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হলে হাইকোর্ট কোটা পদ্ধতি অবৈধ ঘোষণা করেন। সরকার এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে আপিলের রায়ে উপ-সচিব পদে ২৫% কোটা বহাল রেখে তদূর্ধ্ব পর্যায়ে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতি রহিত করা হয়। কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ার অনেক পর তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয় আপিল করে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা আপিলের রায় তাদের পক্ষে নিয়ে আসার জন্য কৌশল অবলম্বন করেছিলেন বলে অভিযোগ আছে।

একটি ক্যাডারকে প্রশাসন ক্যাডার হিসেবে আখ্যায়িত করার অর্থ হলো অন্য কোনও ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত নন বা বাকি ২৮টি ক্যাডারে কোনও প্রশাসন এবং প্রশাসনিক কাজ নেই। প্রশাসন ক্যাডার বাদে অন্য ২৮টি ক্যাডার স্ব স্ব কর্মস্থলে অবশ্যই প্রশাসনিক কাজ করে থাকে।

মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান তার লেখা ঔপনিবেশিক প্রশাসন কাঠামো : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ (উত্তরণ, প্রথম প্রকাশ ১৯৯৯) গ্রন্থে বলেন, একটি বিশেষ ক্যাডার সার্ভিস তাকেই বলা হয় যার ল্যাডার থাকে সচিব পর্যন্ত অর্থাৎ একটা বিশেষ ক্যাডারভুক্ত (এনক্যাডারড) সদস্যরাই অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ এবং পদোন্নতির সাহায্যে স্ব স্ব ক্যাডারের ল্যাডার বেয়ে স্ব স্ব মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ ধাপ সচিব পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ লাভ করে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, যিনি স্বাস্থ্য সার্ভিসের ক্যাডারভুক্ত হয়েছেন তিনিই অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ ও পদোন্নতি লাভ করে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যন্ত সমুদয় পদে যাওয়ার অধিকারী হবেন। এ কথা সত্য যে, মাঠ পর্যায়ে যিনি যে বিষয়ে কাজ করেন, তার অভিজ্ঞতা অন্যদের থেকে বেশি হবে। মাঠ পর্যায়ে অর্জিত জ্ঞান সংশ্লিষ্ট প্রশাসনে কাজে লাগানো গেলে প্রশাসনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কাজে প্রশাসন ক্যাডারের বাইরে অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের থাকার প্রয়োজন বেশি। ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ সম্পর্কে টেকনিক্যাল ধারণাবিহীন একজন যদি ইঞ্জিনিয়ারকে শেখান কি করে তার কাজ করতে হবে কিংবা ডাক্তার কে যদি একজন নন ডাক্তার শেখান কি করে তার কাজ করতে হয় সেটা যেমন অবান্তর তেমনি অপমানজনক। তাই স্ব স্ব পেশার দক্ষ লোকেরাই স্ব স্ব সার্ভিসের প্রশাসনিক কাজে সবচেয়ে উপযুক্ত একথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

প্রশাসন ক্যাডারের জন্য সুপারনিউমারি পদ সৃষ্টি করে লাগামহীন ভাবে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। সেই লাগামহীন পদোন্নতির ধরণটি কেমন? অতিরিক্ত সচিবে মোট পদ ১০৮ অথচ পদোন্নতি পেয়েছেন ৪৩৭ জন, যুগ্ম সচিবে মোট পদ ৪৩০ পদোন্নতি ৯৩২, সহকারী সচিবে মোট পদ ৮৩০ পদোন্নতি ১২৮৮। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এমডিজি এওয়ার্ড পান, সাউথ সাউথ এওয়ার্ড পান, চ্যাম্পিয়ন্স অফ দা আর্থ এওয়ার্ড পান যা মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্য ও কৃষি সার্ভিসে কর্মরত কর্মকর্তা কর্মচারীদের দক্ষতার ফসল অথচ স্বাধীনতার পর থেকে চলে আসা প্রশাসন ক্যাডারের অদক্ষতায় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়ে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ঘোষিত হয়, বাংলাদেশে আমলাদের সাথে কাজ করা সর্বোচ্চ সময় সাপেক্ষ বলে ঘোষিত হয়।

টেকনিক্যাল ক্যাডারে মেধাবীরা ঢুকে যাওয়ায় এবং সেখান থেকে প্রশাসনে কম সংখ্যক লোক আশায় প্রশাসন ক্যাডার প্রায় মেধাশূন্য। অথচ পাকিস্তানী দুর্নীতির ধারায় চলে আসা সুপিরিয়র কমপ্লেক্সিটি, গ্রান্ডিওজ ডিলিউশনে ভোগা প্রশাসন নিজেদের সর্বোচ্চ মেধাবী দাবী করে সকল ক্যাডারকে বঞ্চিত করতে চায়। বাংলাদেশ সার্ভিস রুল ও সংবিধানের নিয়ম বহির্ভূতভাবে সচিব কমিটি পে স্কেল রিভিউ করে সিনিয়র গ্রেড, টাইম স্কেল বাতিল, গ্রেড -১ ও সুপার গ্রেড বিশেষ ক্যাডারের জন্য সংরক্ষণ করে, উপজেলায় অন্য সকল ক্যাডারকে অপমানিত করে বেতন বিলে সাক্ষরের জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করতে চায়। স্বেচ্ছাচারী ও দাম্ভিকতায় ভোগা সুপিরিয়র কমপ্লেক্সিটির এই প্রহসনে বাকি ক্যাডার তো বটেই, প্রশাসন ক্যাডারে থাকা দক্ষ নিষ্ঠাবান অফিসারেরাও জর্জরিত হচ্ছেন প্রতিনিয়ত যা বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে। জাতীয় উন্নয়নের জন্য প্রশাসনিক সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং ভিশন ২০২১ বাস্তবায়ন করতে হলে বর্তমান প্রশাসন কাঠামো রেখে তা সম্ভব নয়। ই-গভর্নেন্স এর সর্বোচ্চ প্রয়োগ ও স্ব স্ব ক্যাডার প্রশাসন সেই ক্যাডারের যোগ্যতমদের হাতে ন্যস্ত করলে এই আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা দূর করে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব।

তথ্যসূত্র: বাংলাপিডিয়া, যায়যায়দিন, কালের কণ্ঠ, সমকাল, ঢাকা টাইমস, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, প্ল্যাটফর্ম, ফেসবুক স্ট্যাটাস- মারুফুর রহমান অপু।

ছবি
সেকশনঃ রাজনৈতিক
লিখেছেনঃ যুক্তিযুক্ত তারিখঃ 28/10/2015
সর্বমোট 7601 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ

সর্বশেষ মন্তব্যকৃত