ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

ভ্রমণ কথাঃ হাওরে বৃষ্টি-জলের গান (প্রথম পর্ব)

বিস্তীর্ণ নীল জলরাশির বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে আমাদের ছোট প্রমোদ তরী চান্নি-পসর রাত। মাথার উপর পূর্ণ চাঁদের জোছনা। হাজার নক্ষত্রের মেলা বসেছে সেখানে। তার ছায়া পড়েছে জলের বুকে। আমরা ক’জন বন্ধু নৌকার ছাদে বসে সেই জ্যোৎস্না রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করছি। বাউল শিল্পীরা সুরের মূর্ছনা তুলেছে......... 
বেশ ক’দিন ধরে এমনটাই ভাবছিলাম সবকিছু ঠিকঠাকই ছিলো- সময়, হাওরের জলরাশি, শিল্পীর গানের মূর্ছনা- সবকিছু; কেবল বাদ সাধলো বৃষ্টি। জ্যোৎস্না আর দেখা হয়নি, কারণ মেঘের আড়ালে ঢাকা ছিলো চাঁদ। তবুও আমাদের যাত্রা থেমে থাকেনি। যতটুকুই পেয়েছি, উপভোগ করেছি পুরোমাত্রায়।  
 
 

    ডাক্তার কিছু সীমাবদ্ধতা বেঁধে দেয়ার পর থেকে একটা বিষয় মনের ভেতরে গেঁথে গেছে। যে করেই হোক মনটাকে হালকা করতে হবে। এই ইট-কংক্রীটের শহর ছেড়ে দূরে কোথাও ঘুরে আসতে হবে। কিন্তু কিছুতেই সময় সুযোগ মিলছিলো না। মেয়ের স্কুল খোলা; আজ এই পরীক্ষা- তো কাল সেই পরীক্ষা, গিন্নী ভীষণ ব্যস্ত। তাই বেড়াতে যাওয়ার কোনরকম চান্স পাচ্ছিলাম না। একা একা তো আর ঘুরতে যাওয়া যায় না! নিদেনপক্ষে একজন কিংবা দু’জন সঙ্গী দরকার; সবচেয়ে ভাল হয় একটা দল সাথে পেলে। অনেকদিন পর হঠাৎ সেই আকাঙ্ক্ষিত সুযোগটা মিলে গেলো। হাওরে ভ্রমণের সুযোগ।
    আমাদের বন্ধু আলমগীর সুনামগঞ্জে পোষ্টিং হওয়ার পর বেশ সুখেই দিন কাটাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিলো। একের পর এক ঘুরে বেড়ানোর ছবি আপলোড করে সবাইকে লোভ দেখাচ্ছিলো। একদিন টাঙ্গুয়ার হাওরে ভ্রমণের ছবি দেখে আমারও খুব লোভ হলো। সুনামগঞ্জের বৈচিত্রময় টাঙ্গুয়ার হাওরের কথা অনেক শুনেছি; সীমান্তের কাছে যাদুকাটা নদী, স্বচ্ছ নীল জলের নীলাদ্রি লেক আর মেঘালয়ের পাহাড়শ্রেণী। কার না দেখতে মন চায়! আমারও যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো খুব, কিন্তু যাওয়া আর হয়নি। ধীরে ধীরে সেই লোভটা প্রবল ইচ্ছায় পরিণত হলো যখন দেখলাম আমাদের ব্যাচের আরও কিছু বন্ধু হাওরে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছে। ব্যাস! শুরু হলো আলোচনা। দিনক্ষণ ঠিক করার জন্য সবার মতামত নেয়া। টার্গেট করা হলো পূর্ণিমা রাতকে কেন্দ্র করে। আসছে পূর্ণিমায় ঈদ। অর্থাৎ এই পূর্ণিমায় যাওয়া হচ্ছে না। সবাই কুরবানি নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, কেউ কেউ গ্রামে যাবে ঈদ উৎযাপন করতে। আগামী পূর্ণিমা আবার একমাস পরে। অগত্যা ঠিক হলো একমাস পরেই যাবো।
    গ্রুপে সদস্য সংখ্যা শতাধিক, সবাইকে আহবান করা হলো। অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করলো তবে শেষ পর্যন্ত সময়-সুযোগের অভাবে কেউ কেউ আমাদের হাওর যাত্রার সঙ্গী হতে পারলো না। সবমিলে হাওর ট্যুরের সদস্য সংখ্যা দাঁড়ালো ২৩ জন। দল হিসেবে একেবারে ছোট নয়। শুরু হলো ট্যুর প্ল্যান। অর্থাৎ কিভাবে যাওয়া। প্রফেসর মিজান গোঁ ধরে বসলো- ট্রেনেই যেতে হবে, এসি এবং বার্থ ছাড়া চলবে না। আমাদের বন্ধু ট্যুর কো-অর্ডিনেটর সাত্তার যথাসাধ্য চেষ্টা করছিলো ট্রেনে বার্থ ম্যানেজের জন্য, তবে শেষ পর্যন্ত বার্থ কিংবা এসি সীট পাওয়া সম্ভব হলো না। সবশেষে পর্যটনের এসি মিনিবাসের ব্যবস্থা করা হলো। ৩০ সীটের নতুন বাস, সীটগুলোও বেশ আরামদায়ক। আমাদের ২৩ জনের দলের জন্য চমৎকার ব্যবস্থাপনা। হাওর ভ্রমণ উপলক্ষ্যে আমাদের ৯১ ব্যাচের লোগোসহ টি-শার্ট এবং ক্যাপ তৈরি করা হয়েছে। হোস্ট আলমগীর আরও জানালো তাহিরপুরে নৌকার ব্যবস্থাও করা হয়েছে এবং টাঙ্গুয়ার হাওরে যতগুলো নৌকা চলে তার মধ্যে সবচেয়ে বড় নৌকাটাই ভাড়া করা হয়েছে। সুনামগঞ্জে রেস্ট নেয়ার ব্যবস্থাপনাও সম্পন্ন। এখন আমরা বেরিয়ে পড়লেই হয়।  
    নির্ধারিত দিনে যথারীতি আমরা সবাই উপস্থিত হলাম মহাখালিস্থ পর্যটন কর্পোরেশনের কার্যালয়ের সামনে। রাত এগারোটায় আমাদের যাত্রা শুরু হল সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে। এরই মধ্যে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হল। মনে আশঙ্কা জাগলো- হাওরে পৌঁছানোর পর বৃষ্টি থাকবে না তো! তাহলে আমাদের জ্যোৎস্না বিলাশের কী হবে! যাই হোক, আমরা ছুটে চললাম সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে। বাসের মধ্যে গল্পে-আড্ডায় সময়টা চমৎকার কাটছিলো। পথিমধ্যে যাত্রা বিরতি হলো আশুগঞ্জে। হালকা খাওয়া-দাওয়া হল উজানভাটি রেস্টুরেন্টে। গুড়িগুড়ি বৃষ্টির মধ্যেই আবার শুরু হল আমাদের যাত্রা সিলেট অভিমুখে।
    বৃষ্টি থাকায় আমাদের গাড়ি ধীর গতিতে চলছিলো। সকালে আমরা যখন সুনামগঞ্জে পৌঁছালাম সূর্য ততক্ষণে তার স্ব-রূপ দেখানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। হোস্ট আলমগীর আমাদের অভ্যর্থনার যথার্থ ব্যবস্থাই করেছিলো। লম্বা জার্নির পর সুনামগঞ্জে হাওর উন্নয়ন বোর্ড গেস্ট হাউজে আমাদের বিশ্রাম এবং সকালের নাস্তার আয়োজন- সুচারুভাবেই সম্পন্ন করে রেখেছে। সবাই ফ্রেস হয়ে নাস্তা সেরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে নিলাম। অনেকে গেস্ট হাউজেই গোসল সেরে নিলো। তবে নদীর কাছাকাছি এসে বাথরুমে গোসলের পক্ষপাতি আমি নই। গেস্ট হাউজ থেকে একটু এগোলেই সুরমা নদী। আমি আলমগীরের সাথে নদীতে চলে গেলাম। নদীর ঠাণ্ডা পানি গায়ে লাগতেই সারা রাতের ক্লান্তি দূর হয়ে গেলো। আমার কাছে নদীতে গোসলের মজাটাই আলাদা। বাড়িতে গেলে কখনও বাসায় কিংবা পুকুরে গোসল করি না। কারণ খুব কাছে কীর্তনখোলা নদী। ছেলেবেলা থেকেই এই কীর্তনখোলা আমার মনে অনেকটা জায়গা করে নিয়েছে। এই নদীর পাড়ে হেসেখেলে আমার শৈশব কাটিয়েছি, আজ অনেকদিন পর তার কিছুটা স্বাদ পেলাম।
    আমাদের আজ রাতের খাবার নৌকায় রান্না হবে। খাসী বারবিকিউ, ফিশ ফ্রাই, হাওরের তাজা গলদা চিংড়ি, আইড় মাছ ইত্যাদি। রান্নাবান্নার যাবতীয় সামগ্রী গোছগাছ করে আলমগীর আর সাত্তার বেলা একটার দিকে আমাদের নিয়ে রওনা দিলো তাহিরপুরের উদ্দেশ্যে। হাওর-বাওরের জন্য বিখ্যাত সুনামগঞ্জের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আমরা এগিয়ে চললাম তাহিরপুরের দিকে। চারিদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। রাস্তার দু-দিকেই জলাভুমি। শুধু জলের রাজত্ব। ইতোমধ্যে বৃষ্টি থেমে গেছে পুরোপুরি, রোদ উঠেছে। আমরা সবাই আশান্বিত হয়ে উঠলাম এই ভেবে যে আজ হয়তো আর বৃষ্টি হবে না। আমাদের হাওর যাত্রা সফল হবে।   
    বিশ্বম্ভরপুর পার হয়ে আরো কিছুটা পথ চলার পরই শুরু হলো বিপত্তি। সামনের রাস্তা পানিতে ডুবে আছে। গতকাল রাতে বৃষ্টিতে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমরা সবাই গাড়ি থেকে নামলাম। অনেক গাড়ি এখানে এসে আটকে পড়েছে। ড্রাইভারকে বলেও কাজ হলো না। অফিসে কথা বলে সে জানালো গাড়ির এসি নষ্ট হবার সম্ভাবনা আছে, তাই আর যাওয়া যাবে না। আমরা চেক করে দেখলাম প্রায় দেড়শ গজের মত রাস্তা পানিতে ডুবে আছে। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জানলাম ওখান থেকে তাহিরপুর ছয়-সাত কিলোমিটার পথ। ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা, টেম্পু, মাইক্রোবাস- অনেককে অনুরোধ করা হলো কিন্তু কেউ পানি ভেঙে যেতে রাজি হলো না। ধীরে ধীরে বেলা গড়াচ্ছিলো। অলরেডি আড়াইটা বাজে, এখনও আমাদের দুপুরের খাবার খাওয়া হয়নি। তাহিরপুরে লাঞ্চ সেরে নৌকায় উঠতে হবে, তাই দেরি করার উপায় নেই। বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে আরও প্রায় আধাঘণ্টা সময় চলে গেলো। অগত্যা সবাই পানিতে নেমে পড়লাম। পানিতে নেমেই বুঝলাম কেন কেউ যেতে রাজি হচ্ছে না। পানিতে বেশ স্রোত, কখনও কখনও নিজেকে সামলানোই মুশকিল। রাস্তায় বিছানো সূচালো পাথরের টুকরার উপর দিয়ে হাঁটতে বেশ সমস্যা হচ্ছিলো সবার। কোথাও কোথাও পানির উচ্চতা হাঁটুর উপরে। অনেক কসরত করে পানির চাপ আর পাথরের আঘাত সহ্য করে আমরা পার হলাম। ওপারে উপস্থিত ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সায় করে যে যার মত ছুটে চললাম তাহিরপুরের দিকে।
 
পায়ে হেঁটে ভাঙা রাস্তা পারাপার
 
    বৃষ্টিভেজা ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে অটো বেশ স্লথ গতিতেই চলছিলো। প্রায় বিশ মিনিট চলার পর আনোয়ারপুরে এসে থেমে গেলো অটো। আবার রাস্তা ভাঙা এবং যথারীতি পানিতে ডুবে আছে। অগত্যা কি আর করা! আবার সেই পানি ভেঙে সামনে এগিয়ে চলা। তবে এবারের যাত্রাটি আরও কষ্টকর। পানির নিচে এবড়োথেবড়ো ব্লকের উপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে বেশ বিপাকে পড়তে হচ্ছে। একটু অসাবধান হলেই বিপদ। যাই হোক শেষ অবধি পানিপথের যুদ্ধ শেষ করে আমরা সবাই ওপারে পৌঁছলাম। তবে আলমগীর আর সাত্তারের জন্য যুদ্ধটা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ালো, কারণ- নৌকায় রাতের খাবার রান্নার যাবতীয় সামগ্রী তাহিরপুরে বয়ে নিয়ে যাবার দায়িত্ব ওরাই কাঁধে তুলে নিয়েছিলো। আবার অটো ধরে তাহিরপুরে পৌঁছুতে আমাদের বেলা চারটা বেজে গেলো।
    হোস্ট আলমগীর তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় আমাদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করে রেখেছিলো। বিআরডিবি উপজেলা দপ্তর তাহিরপুরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। আমরা সবাই ওখানে ফ্রেস হয়ে দুপুরের খাবার খেলাম। এর মধ্যেই আবার শুরু হলো বৃষ্টি। আকাশের অবস্থাও ভাল নয়। নাহ! এই বৃষ্টির বাড়াবাড়ি আর ভাল লাগছে না। এত কষ্ট করে আসলাম, এখন বসে থাকতে ভাল লাগে! বন্ধু বাকী অবশ্য প্রশ্ন তুলেছিলো- এই বিরূপ আবহাওয়ায় নৌকা নিয়ে হাওরে যাওয়া উচিৎ হবে কি-না; তবে আমরা অনেকেই হাওরে যাওয়ার ব্যাপারে অনড় ছিলাম। এতদূর এসে হাওরে নামবো না, তাই কী হয়! আরও বেশ কিছু সময় পর বৃষ্টি কমে এলো। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম- আর দেরি নয়, এখনই বেরিয়ে পড়তে হবে। বৃষ্টিস্নাত স্নিগ্ধ বিকেল। শেষ বিকেল। কিছুক্ষণ আগে যে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে, প্রকৃতিতে তার রেশ রয়ে গেছে এখনও। এমন ভেজা আবহাওয়ায় অভিমানী সূর্য কী আর দেখা দেয়! অগত্যা আমরা ধীরে ধীরে ঘাটের দিকে এগিয়ে চললাম।  
 
থানাঘাটায় প্রস্তুত আমাদের হাওর যাত্রার বাহন- নৌকা
 
    আমরা সবাই দাঁড়িয়ে আছি তাহিরপুরের থানাঘাটায়। সামনে দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি। পাশেই ভিড়ানো আগে থেকে ভাড়া করে রাখা আমাদের হাওর-যাত্রার বাহন- নৌকা। কারুকাজ করা সুন্দর একটি নৌকা। এতক্ষণে সবার মুখে ফুটলো তৃপ্তির হাসি। এত ঝঞ্ঝাল পেড়িয়ে শেষ অবধি আমরা সেই আকাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছালাম। সবাই যার যার ব্যাগেজ নিয়ে নৌকায় উঠে বসলাম। রাতে নৌকায় রান্নার যাবতীয় সরঞ্জামও তুলে নেওয়া হল। বৈরী আবহাওয়াতেই আমাদের যাত্রা শুরু হল। তাহিরপুরের থানাঘাটা থেকে আমাদের নৌকা ছাড়লো, গন্তব্য- টেকেরঘাট; ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়ের ঠিক পাদদেশে। হাওর ভ্রমণে আসা বেশির ভাগ মানুষ এখানেই রাত কাটায়। আজকের রাতটা আমরা ওখানেই কাটিয়ে দেবো। পরদিন সকালে সবাই মিলে বেরিয়ে পড়বো। বাংলার কাশ্মীরখ্যাত নীলাদ্রি লেক, যাদুকাটা নদী, বারিক্কা টিলা, শিমুল বাগান ঘুরে আবার মূল হাওরে ঢুকে পড়বো। ওয়াচ টাওয়ারের চারিদিকে ডুবন্ত হিজল-করচের বনের কাছে নেমে গোসল করবো, তারপর আবার ফিরে আসবো তাহিরপুরে। আগামীকাল বিকেলের মধ্যেই সেখান থেকে রওনা দেবো ঢাকার উদ্দেশ্যে। আর সৌভাগ্যক্রমে যদি রাতে চাঁদ দেখা দেয় তবে আমাদের ভ্রমণ সম্পুর্ণরূপে সার্থক হয়!
 
তাহিরপুরের থানাঘাটায় নৌকায় ওঠার পর আমরা কয়েকজন
 
    কেউ কেউ সেলফি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো। কিছু গ্রুপ ছবিও তোলা হলো। আমি তাকিয়ে ছিলাম সামনের দিকে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বার বার দেখছিলাম, মনে ক্ষীণ আশা যদি মেঘ সরে গিয়ে আকাশ পরিষ্কার হয়। আমি বরাবরই একটু স্মৃতিকাতর মানুষ। সামনের থৈথৈ জলরাশি নিমেষেই আমাকে শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে গেলো। আজকের এই হাওরভ্রমণ ছেলেবেলায় ভরা নদীতে নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর স্মৃতিকে নতুন করে জাগিয়ে তুললো আবার।
    নীল জলরাশির বুক চিরে ছুটে চলেছে আমাদের ইঞ্জিনচালিত নৌকা। উপরে খোলা আকাশ আর দূরে আকাশ যেখানে দিগন্তে মিশেছে তার পায়ের কাছে মেঘালয়ের পাহাড়গুলি যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। দিনের শেষ আলোটুকু মিলিয়ে গেলে চারিদিকে ধীরে ধীরে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছিলো। আকাশ মেঘলা তাই জ্যোৎস্না দেখার আশা ছেড়েই দিয়েছি আমরা। আমাদের সবারই প্রত্যাশা ছিলো বিকেলে নৌকাযাত্রা শুরু করে হাওরে বসেই সূর্যাস্ত দেখবো, তারপর রাতে ধবল জ্যোৎস্নায় স্নান করতে করতে হারিয়ে যাবো অন্য জগতে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে তার কিছুই হলো না। আমি বুঝে গেলাম এই অন্ধকারে হাওর দর্শনের আশা বৃথা। যা দেখার আগামীকালই দেখতে হবে।
    আলমগীর নৌকার ছাদে এসে বললো- সবাই এত চুপচাপ কেন? এখন বাউল গান হবে, আমরা নাচবো। হ্যা, তাহিরপুর থেকে বাউল শিল্পীদের একটা দল আমাদের সাথে নৌকায় যোগ দিয়েছে। বাউল হীরা মোহন ও তার দল। শিল্পীরা তাদের বাদ্যযন্ত্র নিয়ে নৌকার ছাদের মাঝখানে আসন গেড়ে বসলো। দলে সদস্য সংখ্যা তিনজন। বাউল হীরা মোহন নিজে হারমোনিয়াম, অল্পবয়সী একটি ছেলে ঢোল এবং লাল রঙের ফতুয়া পরনে পাগড়ি মাথায় কাঁচাপাকা শ্মশ্রুমণ্ডিত একজন খঞ্জরি নিয়ে প্রস্তুত। সিলেট অঞ্চলের মরমী শিল্পী শাহ আব্দুল করিমের একটি বিখ্যাত গান দিয়ে শুরু হলো তাদের পরিবেশনা-
 
গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান
মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম
আমরা আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম...

 
সবাই যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল। আলমগীর সত্যি সত্যিই নাচতে আরাম্ভ করলো, সাথে আরও কয়েকজন যোগ দিলো। আসর বেশ জমে উঠলো। এর মধ্যেই সাত্তার মুড়ি মাখিয়ে নিয়ে হাজির। রসিক সাত্তার অবশ্য কোমল পানি, কঠিন পানির ব্যবস্থাও রেখেছিলো। যার যেমন প্রয়োজন- তুলে নিলো। খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা-গানে বেশ জমে উঠলো আসর। এই সুনামগঞ্জে অনেক মরমী বাউল সাধকের জন্ম। তাদের গানে হাওরের জীবনের দুঃখগাঁথাই বেশি ফুটে ওঠে। একে একে আরও অনেকগুলো গান হয়ে গেলো। শাহ আব্দুল করিম, হাছন রাজা ও সিলেট অঞ্চলের আরও কিছু জনপ্রিয় গান।

চলবে...... 

ছবি
সেকশনঃ অন্যান্য
লিখেছেনঃ নিভৃত স্বপ্নচারী তারিখঃ 07/10/2019 11:18 PM
সর্বমোট 249 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ