ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

ছোটগল্প: এক পৃথিবী জোছনা

ছোটগল্প:
এক পৃথিবী জোছনা
সাইয়িদ রফিকুল হক

 
প্রায় সারাদিনের অফিস-শেষে বাসায় ফিরে মোরশেদসাহেব প্রতিদিন নিজেদের বারান্দায় বসে থাকেন। আজও তিনি তা-ই করলেন।
এই শহরে তার মতো সাধারণ একজন মানুষের যাওয়ার আর তো কোনো জায়গা নাই।
বারান্দাটা খুব নিরিবিলি আর প্রশস্ত। এখানে বসে থাকতে তার খুব ভালো লাগে। এক অফিস আর এই বারান্দা—তার খুব প্রিয়।
 
তিনি খুব একটা টেলিভিশন দেখেন না। তবে প্রতিদিন শুধু একটা বিশেষ চ্যানেলে খবর শোনেন। এছাড়া দীর্ঘদিন যাবৎ তিনি আর টেলিভিশন দেখেন না। তিনি টিভি দেখা ছেড়ে দিয়েছেন। আগে মানুষের কাছে টেলিভিশন ছিল আনন্দদায়ক আর এখন তা ভয়াবহ যন্ত্রণাদায়ক।
তার কাছে টিভি দেখাটা এখন সময়-অপচয় বলে মনে হয়। তারচেয়ে তিনি তাদের এই প্রশস্ত বারান্দায় বসে দিনে-রাতে সুনীলআকাশটা দেখতে বেশি ভালোবাসেন। আর মাঝে-মাঝে এখানে বসে তিনি এখনও খুব মন দিয়ে শরৎসাহিত্য পড়েন। তার এই জীবনে তিনি যে কতবার শরৎচন্দ্রের ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পটি পড়েছেন—তার কোনো হিসাব নাই। আগে তিনি এই গল্পটি শেষ করে কাঁদতেন। মানুষের দুঃখ-কষ্ট সবসময় তাকে খুব ভারাক্রান্ত করে তোলে। তিনি মানুষের দুঃখ দেখতে পারেন না। মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাকে খুব স্পর্শ করে।
 
মাঝে-মাঝে দিনের বেলা—বিকালে কিংবা পড়ন্ত বিকালে—তিনি আকাশটা দেখতে খুব পছন্দ করেন। যেদিন তার অফিস থাকে না কিংবা অফিস থেকে একটু আগে বাসায় ফিরতে পারেন—সেদিন তিনি ছোট্ট শিশুর মতো মুগ্ধচোখে তাকিয়ে থাকেন সুনীলআকাশের দিকে। রাতের আকাশটা তার কাছে কেমন যেন এক মোহনীয় রূপের মতো মনে হয় আর ভীষণ অন্যরকম লাগে!
 
তার স্ত্রীর আকাশ দেখতে ভালো লাগে না। বইপড়তে ভালো লাগে না। কবিতা পড়তে ভালো লাগে না। কবিতাআবৃত্তি শুনতেও ভালো লাগে না। গল্প করতেও তেমন-একটা ভালো লাগে না। তার ভালো লাগে টিভির মেগাসিরিয়াল-নাটক দেখতে, ভালো-ভালো আর মুখরোচক খাবার খেতে, আর একসঙ্গে অনেক টাকা জমিয়ে মাঝে-মাঝে শপিং করতে।
মোরশেদসাহেবের এসব একদম ভালো লাগে না। তারা দুইজন প্রায় দুই মেরুর লোক। তবুও তারা কেমন করে যেন এতোটা বছর পার করলেন! আর তারা এতোটা বছর কী করে যে পার করলেন—তা কেউ গবেষণা ছাড়া হয়তো বলতেই পারবে না।
মোরশেদসাহেব এর আসল রহস্যটা জানেন। তাদের এই সংসার টিকে থাকার মূলে তাদের বড় মেয়ে সুলেখা। তার মায়ার বাঁধনে মোরশেদসাহেব আজও সংসারের সকল জ্বালা-যন্ত্রণা, ব্যথা-বঞ্চণা, আর যাবতীয় লাঞ্ছনা অকাতরচিত্তে সহ্য করে যাচ্ছেন।
সুলেখা আসলেই বড় ভালোমেয়ে। কী সুন্দর করে গান গায় সে! দারুণ কবিতাআবৃত্তি করে! আর সে নিয়মিতভাবে কী সুন্দর করে বইপড়ে! বইপড়তে তার খুব ভালো লাগে। বাবার মতো সেও খুব পড়ুয়া। তার প্রিয় লেখক-সাহিত্যিকের তালিকায় রয়েছেন—রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, মানিক, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, বঙ্কিমচন্দ্র, শেক্সপীয়ারসহ আরও অনেকে।
তার এই বড় মেয়েটি ঠিক তার মতো বইপড়ার বিরাট স্বভাবটি অর্জন করেছে। সুলেখাকে তার এই জন্য আরও বেশি ভালো লাগে। এইজন্য তিনি সুলেখাকে এতো বেশি ভালোবাসেন।
তার অন্য দুটি ছেলে-মেয়েও ভালো। তবে সুলেখার মতো তারা কেউই মোরশেদসাহেবকে বোঝে না।
তার যখন খুব মনখারাপ থাকে তখন তিনি সুলেখার পাশে বসে থাকেন। সে ছাড়া এই জগতে কেউ তার দুঃখ বোঝে না।
তার একবার খুব জ্বর হয়েছিল। মাথায় পানি দেওয়াটা খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল তখন। তবুও তার স্ত্রী মেগাসিরিয়াল মিস হবে ভেবে—তার মাথায় সময়মতো পানি না দিয়ে—শুধু ওষুধ খাইয়ে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিলেন! তখন সুলেখা কলেজে পড়তো। সে কলেজ থেকে বাসায় ফিরে সেদিন খুব মনখারাপ করেছিল। আর এই নিয়ে সে খুব রাগারাগি করেছিল মায়ের সঙ্গে। আর সে অনেক সময় পর্যন্ত বাবার মাথায় পানি দিয়েছিল। পরদিন সে আর কলেজে যায়নি। বাবা না থাকলে তার পৃথিবীটা যে একেবারে অন্ধকার হয়ে যাবে!
মোরশেদসাহেব সেদিনই বুঝেছিলেন তার মা যেন সুলেখারূপে আবার ফিরে এসেছেন!
 
রাতের আকাশ দেখতে-দেখতে মোরশেদসাহেব কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলেন! কোন্ স্বপ্নআকাশে যেন চলে গিয়েছিলেন! তার বড়আদরের সুলেখা সেই কখন থেকে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে—তিনি তা বুঝতেই পারেননি!
মোরশেদসাহেব যখন সম্বিৎ ফিরে পেলেন—সুলেখা তখন হেসে ফেললো।
সে হাসিমুখে বললো, “বাবা, চা খাবে?”
না। এখন খাবো না। তুই শুধু আমার পাশে বস।
বাবার কথা শুনে তার মন ভরে গেল। সে হাসিমুখে তার বাবার পাশে বসে পড়ে। সুলেখার মনে হলো—এরচেয়ে কোনো নিরাপদ জায়গা পৃথিবীতে আর নাই।
সুলেখা অন্য একটা চেয়ারে বসলেও সে যেন তার বাবার কোলঘেঁষে বসেছে। সেও কিছুক্ষণ তার বাবার মতো সুনীলআকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো।
একটু পরে সে বলে, “বাবা, আজ কি চাঁদ উঠবে? মানে, জোছনার চাঁদ উঠবে কিনা?”
মোরশেদসাহেব হেসে বললেন, “না-রে মা, আজ হয়তো দশমীর চাঁদ। তেমন-একটা জোছনা হবে না। আর তিন-চারদিন পরেই চতুর্দশীর পূর্ণিমার চাঁদ উঠবে। একটু পরে ক্যালেন্ডার দেখে সঠিক তারিখটা জেনে রাখবো। সেদিন, আমরা পূর্ণিমার চাঁদ দেখবো।”
তারপর তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “জোছনা দেখতে হলে তোকে গ্রামে যেতে হবে, মা। সেখানে আছে জোছনার সাগর! সারাগ্রাম ভেসে যায় রুপালি জোছনায়! তখন চোখ ফেরানো যায় না, মা। ছোটবেলা থেকেই আমার জোছনা খুব ভালো লাগে।”
সুলেখা বলে, “বাবা, আমারও।”
ওর কথা শুনে মোরশেদসাহেব হাসলেন।
তারপর সুলেখা মুগ্ধচোখে বলতে থাকে, “বাবা, একদিন আমি জোছনা দেখতে আমাদের গ্রামে যাবো। খুব সাদা জোছনায় অবগাহন করবো। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখবো দুধসাদা জোছনা। আর সেই মোহনীয় জোছনার কয়েক মুঠো সঙ্গে করে নিয়ে আসবো। তোমার সঙ্গে একদিন আমি গ্রামে যাবো—আর গিয়ে থাকবো কিছুদিন।”
মোরশেদসাহেব হাসিমুখে বলেন, “তোর দেখি আমার মতো জোছনাও এতো ভালো লাগে!”
সুলেখাও হেসে বলে, “ভালো লাগবে না কেন বাবা? আমি তো তোমারই মেয়ে।”
মোরশেদসাহেব খুব সন্তুষ্টির সঙ্গে বলেন, “হ্যাঁ, তুই তো আমারই মেয়ে।”
সুলেখা একসময় জানতে চাইলো, “আচ্ছা বাবা, তুমি কি কোনোদিন-কখনো জোছনারাতে না ঘুমিয়ে কাটিয়েছ?”
কিছুটা হাসির সঙ্গে মোরশেদসাহেব বললেন, “কী বলিস মা তুই! সেই সময় কতদিন আমি জোছনারাতে ঘুমাইনি। তখন তো আমি গ্রামে থাকতাম। আর তখন—বয়সে ছিলাম একেবারে কিশোর। এতো সুন্দর জোছনা দেখে আমার চোখে সহজে ঘুম আসতো না। তখন আমার মা বলতেন—তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড় তো বাবা। কাল না তোর স্কুল আছে! আমি তবুও ঘুমাতে পারতাম না। বিছানায় শুয়ে ঘরের পায়ের দিকের একটা জানালা খুলে চেয়ে থাকতাম বাইরের দিকে। কী সুন্দর আলো ঝলমলে জোছনা ছিল তখন! তবে সারারাত জাগতে পারতাম কিনা জানি না। কী-একটা আবেগে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে-জেগে তখন শুধু জোছনা দেখতাম! আর কখন যে ঘুমিয়ে পড়তাম—তাও জানতাম না! সেই অফুরন্ত জোছনা এখন আর কোথায় পাবো?”
সুলেখা আবেগভরে বলে, “বাবা, আমিও এরকম জোছনা দেখতে চাই।”
মোরশেদসাহেব তখন পরম মমতায় মেয়ের মাথায় হাতবুলিয়ে বললেন, “দেখাবো মা, দেখাবো। তোর ভার্সিটি বন্ধ হলে এবার তোকে ক’দিনের জন্য আমাদের গ্রামে নিয়ে যাবো। দেখবি, কী গ্রাম আমাদের! এখন আর অজপাড়াগাঁ বলে কিছু নাই। তার বদলে সেখানে এখন ইউরোপের মতো একেবারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন গ্রাম!”
একটু থেমে মোরশেদসাহেব আবার বলতে লাগলেন, “শুধু কি সেখানে জোছনা আছে? আরও আছে পাখিডাকা শান্ত, স্নিগ্ধ ও নির্জন সকাল—খুব মৌনী আর ধ্যানী মধ্যদুপুর—আর অলস দুপুরে ঘুঘুর মোহনমধুর ডাক! বলতে গেলে—এটা আমাদের চিরায়ত ভালোবাসার একটা গ্রাম।”
সব শুনে একেবারে মুগ্ধ হয়ে সুলেখা ছোট্ট শিশুর মতো বলে, “বাবা, আমি ঘুঘুপাখি দেখবো। আর তার ডাক শুনবো।”
মোরশেদসাহেব একটু হেসে বললেন, “শুনবি রে মা। অবশ্যই শুনবি। এবার তোকে আমাদের গ্রামে নিয়ে গিয়ে কতরকমের জলজ্যান্ত ঘুঘু দেখাবো।”
ঘুঘু-দেখার কথা শুনে—আনন্দে সুলেখা তখন হাসতে থাকে।
মোরশেদসাহেব আবার আকাশ দেখতে লাগলেন। আকাশ দেখে তার মন ভরে না। সেখানে কীসের যেন একটা হাতছানি! তিনি কী-এক দুনির্বান আকর্ষণে আকাশ দেখতে থাকেন!
 
হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে সুলেখা বলে, “বাবা, একটা দূরবীণ বা বড় টেলিস্কোপের দাম কত?”
মোরশেদসাহেব খুব অবাক হয়ে বললেন, “কেন রে মা? আর তুই হঠাৎ টেলিস্কোপের দাম জিজ্ঞাসা করছিস যে! টেলিস্কোপ দিয়ে কী করবি?”
সুলেখা খুব সুন্দর করে হেসে বলে, “একটা কিনতাম। একদিন কিনবো। আমি একটা বড় চাকরি পেলে তোমার জন্য একটা টেলিস্কোপ কিনবো। তখন তুমি বারান্দায় বসে টেলিস্কোপ দিয়ে রাতের আকাশ দেখবে!”
মেয়ের কথা শুনে মোরশেদসাহেবের চোখে জল এসে গেল। তিনি এই জলটুকু আটকাতে চেষ্টা করেছিলেন—কিন্তু পারেননি।
দুঃখে অনেকের চোখে জল আসে—আর মোরশেদসাহেবের চোখে জল আসে অতিআনন্দে। তিনি বুঝতে পারলেন—হয়তো তার নিজের গুণে নয়—পূর্বপুরুষের বিরাট পুণ্যের ফলে আজ এমন একটি মেয়ে পেয়েছেন!
মেয়েটি যেন তার অনেকবড় হয়—উন্মুক্ত আকাশের মতো তার হৃদয়টা একেবারে খুলে গিয়ে মেয়েটির জন্য বিশেষ প্রার্থনা বেরিয়ে এলো। তার মনে হলো—মহান ঈশ্বর হয়তো তার প্রার্থনা শুনছেন।
 
রাতে বারান্দায় কখনো লাইট জ্বালান না মোরশেদসাহেব। একটা অন্ধকারের মুখোমুখি বসতেই তার সবসময় ভালো লাগে।
অন্ধকারে অনেকটা সময় বসে থেকে সুলেখা বলে, “চলো বাবা, এবার ভিতরে যাই। আজ যখন জোছনা উঠবে না—তখন আর বসে থেকে কী হবে?”
মোরশেদসাহেব হেসে বললেন, “কে বলেছে—আজ জোছনা ওঠেনি? কিছুক্ষণ আগেই তো আমাদের এই বারান্দায় এক টুকরো জোছনা এসে পড়েছে!”
সুলেখা হাসতে-হাসতে খুব অবাক হয়ে বলে, “কোথায় বাবা? কোথায়? আমি তো দেখলাম না!”
মোরশেদসাহেব নির্মল হাসিতে সারাটা বারান্দা ভরিয়ে দিয়ে বললেন, “মা-রে, তুইইতো আমার এক পৃথিবী জোছনা। তুইইতো আমার হাজার পূর্ণিমাভরা জোছনারাতের আলো। তুইইতো আমার এক পৃথিবী ভালোবাসা। আর চিরদিনের আঁধার ঘরের মানিক!”
 
বাবার কথা শুনে সুলেখার দুচোখ ভরে ওঠে রুপালি জলে। আর মুক্তোদানার মতো কয়েক ফোঁটা জল নিচে গড়িয়ে পড়লো!
 
 
সাইয়িদ রফিকুল হক
২৬/১১/২০১৯

ছবি
সেকশনঃ কবিতা
লিখেছেনঃ সাইয়িদ রফিকুল হক১ তারিখঃ 18/03/2020
সর্বমোট 164 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ