ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ চোরকুঠুরি (Life Left Behind) - পর্ব-২

মানুষের মনের গভীরে জমে থাকে রঙ বেরঙের স্মৃতির ফসিল। চুরি যাওয়া শৈশবের ছোট ছোট সুখ-দুঃখ, ভালোলাগা কিংবা বিরক্তিকর অনুভূতিগুলো নিজের অজান্তেই কখনও কখনও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনোজগতের সেই বিচিত্র সব অনুভূতি অনেককেই তাড়িয়ে বেড়ায়। একান্নবর্তী পরিবারে প্রত্যেকটি মানুষ একে অন্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত। কেউ মানসিকভাবে, কেউ শারীরিক, সামাজিক, আর্থিক কিংবা কখনও কখনও সম্পদ অধিকারের ভিত্তিতে। সময়ের সাথে সাথে যে ছেলেটি কিংবা মেয়েটি বড় হয়ে যায়, তারও শিশুবেলা কিংবা কিশোর বেলার অনেক স্মৃতি জমে থাকে একান্নবর্তী পরিবারের ঘুলি-ঘুপচিতে। প্রত্যেকটি মানুষের মনের অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়ায় দেখা না দেখা অনেক কামনা-বাসনা, ঘটনা দুর্ঘটনার জীবম্মৃত কঙ্কাল। একান্ত অবসরে যখন সে নিজের ভেতরে ডুব দেয়, মনের ছোট্ট চোরকুঠুরিতে আঁতিপাঁতি করে খুঁজে ফেরে সেইসব ফেলে আসা দিনের স্মৃতি।
চলমান বর্তমান, আর অতীত জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর নানা ঘাত-প্রতিঘাত নিয়েই এগিয়ে যায় উপন্যাস- চোরকুঠুরি।


পর্বঃ দুই

প্রথম পর্বের পর ......

তবে মা আর কাজলকে খুব ভালোবাসেন দাদু। মাঝে মধ্যেই ওদের দেখতে আসেন। এটা-ওটা, কত কি যে নিয়ে আসেন! দু’একদিন ওদের সাথে কাটিয়ে আবার বাড়িতে ফিরে যান। কাজল মাকে বলেছিলো দাদুকে ওদের সাথে রেখে দিতে। মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, ‘উনি এখানে থাকবেন না বাবা।’ ‘তাহলে ওঁকে কে রান্না করে দেবে?’ কাজলের কণ্ঠে উদ্বেগ। ‘তোমার দাদুর বোন, যাকে তুমি ছোটদাদী বলে ডাকো, তিনিই তোমার দাদুর দেখাশোনা করছেন। আমরাও মাঝে মধ্যে যাবো। আর বড় হলে তোমার যেখানে থাকতে ইচ্ছে হবে সেখানেই থেকো।’ মা এটুকু বলেই কাজলকে যেন সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।
জানালার পাশে বসেই কাজল কান পাতলো। ঘরের ভেতরে কোনো শব্দ নেই। কাজল পা টিপে টিপে একবার ভেতরে গেলো। মা এখন ঘরে নেই। পেছনের খোলা চত্বরে চুলায় মাছ রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যতই রাগ করুক, কাজল ঠিক ঠিক জানে মা ওর জন্য মাছ রান্না করছেন। কিন্তু মাকে তো কোথাও দেখা যাচ্ছে না! কোথায় গেলেন? পুকুরে? মায়ের কোন ভয়-ডর নেই। যত রাতই হোক মা একা একাই ঘরের পেছনে যান, পুকুরে কাজ করেন। কাজল কখনও একা একা এদিকে আসতে পারে না। এমনকি বাথরুমে যেতে হলেও মাকে ডেকে নেয়। আর খালের পাড়ে গেলে টিপু ভাইয়াকে সাথে নিয়ে নেয়। টিপু ভাইয়া কিন্তু একা একাই যেতে পারে। এ বাড়ির অন্যরাও। কাজল যে কবে একা একা চলতে পারবে!
চারিদিকে অন্ধকার নেমে আসছে। ময়নাটা যে কোথায় গেল! সন্ধ্যাবাতিটা কাজল নিজেই জ্বেলে নিলো। তারপর পড়ার টেবিলে বই নিয়ে বসলো। বিকাল থেকেই ইলেক্ট্রিসিটি নেই। প্রায় দিনই এই সময়ে থাকে না। এটা যেন পল্লীবিদ্যুতের নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজল বিড়বিড় করে বললো- আরে বাবা! যদি ঠিকমত কারেন্ট থাকবেই না, তাহলে এই লাইন দেবার দরকারটা কী! জানালা দিয়ে দখিনের হাওয়া এসে বাতিটা বারবার নিভিয়ে দিচ্ছিলো। কাজল কয়েকবার ময়নাকে ডাকলো। কোন সাড়া নেই। শেষমেশ নিজেই উঠে ভেতর ঘর থেকে হারিকেনটা নিয়ে এলো। ওটা জ্বেলে দিতেই মনে স্বস্তি ফিরে এলো। ‘এবার পারলে নিভাও’ কথাগুলো শূন্যে ছুড়ে দিয়ে একগাল হাসলো। ঘরের ভেতর থেকে কুটকাট আওয়াজ আসছে। মনে হয় মা মাছ কাটতে ব্যস্ত। মায়ের চোখ রাঙানি দেখলেও টিপু ভাইকে যে চমকে দিতে পেরেছে এতেই বেজায় খুশি কাজল। অত্তবড় মাছটা দেখে টিপু ভাইয়ার চোখ তো ছানাবড়া।
কাজল বই বের করে পড়তে বসেছে।  তবে আজ পড়ায় মন বসছে না। ঘরের ভেতর থেকে কোন শব্দ আসছে না। বোধহয় মা পুকুরে গেছে। একবার গিয়ে দেখে আসবে নাকি? না, থাক। মা আজ ভীষণ ক্ষেপে আছে। আজ রাতে আর ওর সাথে কথা বলবে না। তবে ঘুমের সময় মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে ঠিকই। কাজল তখন ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকে।  মা মাঝে মাঝে কাঁদে। নিঃশব্দে। ভাবে কাজল বুঝতে পারছে না, কিন্তু ও ঠিকই টের পায়। তখন খুব ইচ্ছে করে মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দেয়। পাছে মা বুঝতে পারে, এই ভেবে চুপ করে শুয়ে থাকে।
কাজল যতটা ভেবেছিলো, মা তার থেকেও বেশি রেগে আছে। তবুও ও আজ খুশি। টিপু ভাইকে একহাত দেখিয়ে দিতে পেরেছে সে। টিপু ওর খালাতো ভাই, কাজল থেকে প্রায় তিন বছরের বড়। টিপুর মা ছালেহা খালা ওর মায়ের চাচাতো বোন। কাজল ও টিপু ছবিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। টিপু ক্লাস ফাইভে আর কাজল ফোরে।
প্রায় নিঃশব্দে এসে জানানা ঘেঁষে দাঁড়ালো টিপু।  কাজল দেখলো জানালার ছোট্ট দরোজায় কারো ছায়া পড়েছে। মুখের অবয়ব দেখেই অগন্তুককে চিনে ফেললো। কাজল মুচকি হেসে খুব আস্তে করে বললো,
‘টিপু ভাই, ভেতরে আসো।’
‘তুই ক্যামনে বুঝলি? আমি তো শব্দ করি নাই।’ টিপু ভেতরে এসেই কাজলের উদ্দেশ্যে বললো।
একদম যে শব্দ হয় নাই তা কিন্তু না, ওতেই বুঝে গেছি। তাছাড়া তুমি নিজেকে লুকাতে পারো না।’
‘হুম! আমাদের বুদ্ধিমান কাজল। তা সবজান্তা মশাই আজ এতবড় মাছটা ধরলেন ক্যামনে?’
কাজল বিজ্ঞের মত উত্তর দিলো। ‘সবাই য্যামনে ধরে, তেমনেই ধরছি। কী ভাবছো, তুমি ছাড়া আর কেউ মাছ ধরতে পারে না?’
‘আমি কি কইছি নাকি তুই মাছ ধরতে পারোস না?’
‘এমনিতে বলো নি, কিন্তু সবসময় তাই বুঝিয়েছো।’
বাইরে থেকে খুক খুক করে কাশির শব্দ আসছে।  কাজল ফিক করে হেসে ফেললো।  তারপর ফিসফিস করে বললো, ‘ঐ আসছে কাইশ্যা মামা!’
‘এই আস্তে বল, শুনতে পাবে তো!’
‘আরে দূর! উনি কানে খাটো।’
মুচকি হেসে টিপু বললো, ‘তুই পারোসও।’
একটু পরেই আবেদ আলীকে দেখা গেলো কাশতে কাশতে খাল পাড়ের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। সে চোখের আড়াল হলে কাজল মৃদু হেসে নিচু গলায় বললো, ‘শোনো, আমি অনেকদূর থেকে এই কাশির শব্দ শুনে বলে দিতে পারবো এটা কাইশ্যা মামা’।
‘থাক, তোকে আর পাকামি করতে হবে না। ’
ঘরের ভেতর থেকে পায়ের শব্দও আসতেই কাজল ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে টিপুকে চুপ করতে বললো। টিপু ইশারায় জিজ্ঞেস করলো, ‘কি হয়েছে?’
‘মাছ ধরেছি তাই মা ভীষণ ক্ষেপে আছে। আমার সাথে কথা বলছে না।’
টিপু নিঃশব্দে হাসলো।
 
এ বাড়িতে দুই ঘর বাসিন্দা।  কাজলদের ঘর উত্তরের ভিটেয়। সামনে বিশাল উন্মুক্ত উঠোন, তার ওপাশে দক্ষিণ দিকটা সম্পুর্ণ খোলা। ওদিক থেকে হু-হু দখিনা হাওয়া এসে ওদের ঘরের দাওয়ায় আছড়ে পড়ে।  েসপশ্চিমের ভিটেয় ওর নানার একমাত্র বড় ভাই এন্তাজ আলী কাজীর ঘর। সেখানে তিনি তাঁর তিন ছেলে আর এক মেয়ের বিশাল পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। কাজল তাকে বড় নানা বলেই ডাকে। ওর নিজের মৃত নানা মিনহাজ আলী কাজীর একমাত্র কন্যা ওর মা, রূপা। প্রায় আট একর জমির উপর বিশাল এই বাড়িটার ছ’আনা সম্পত্তির মালিক কাজলের মা। বাড়ির বাইরেও ত্রিশ একর ফসলী জমি। নদীর ওপারে কৈতরীচরে প্রায় বিশ একর জমিরও সমপরিমাণ মালিক সে। বাড়ি এবং বাড়ির বাইরে বাদবাকী দশ আনার সম্পত্তির মালিক এন্তাজ আলী কাজী।
এন্তাজ আলী কাজীর বয়স প্রায় আশি। নিজে চলাফেরা করতে পারেন না বললেই চলে। ছেলে-মেয়ে আর নাতি-নাতনিরা মিলে তার দেখাশোনা করে। তার পাঁচ ছেলেমেয়ে। বড় ছেলে আবেদ আলী পার্শ্ববর্তী মফঃস্বল শহর বদরগঞ্জে রেজিস্ট্রি অফিসের মুহুরী ছিল। তবে এখন আর কাজ করতে পারে না। আটান্ন বছর বয়সে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। নানা রোগ ব্যধিতে আক্রান্ত। তবে সে বেশ চতুর ও স্বার্থপর ধরণের মানুষ। আবেদ আলী কাজীর তিন ছেলে এক মেয়ে। একান্নবর্তী পরিবারের বড়ছেলে হলেও নিজের স্বার্থটাই সবার আগে তার কাছে প্রাধান্য পায়। এন্তাজ আলীর মেজছেলে মাজেদ আলী কাজী পোষ্টঅফিসে চাকুরী করে। অনেকটাই ছন্নছাড়া জীবন যাপনে অভ্যস্ত। তাস আর জুয়ায় তার আসক্তির খবর কারো অজানা নয়। শোনা যায় মেয়েমানুষে প্রতিও দুর্বল সে। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হলেও তার ভাবভঙ্গিতে মনে হয় একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা। তারও এক ছেলে দুই মেয়ে। বৃদ্ধ এন্তাজ আলীর বাকী দুই ছেলে ওয়াজেদ আলী ও সাজেদ আলী। সেজো ছেলে ওয়াজেদ আলী ট্রলারের সারেঙ। কারো সাথে পাছে নেই। সে বাড়িতে থাকে না, শ্বশুরালয় ফরিদপুরে তার বসবাস। মাঝে-মধ্যে বাড়িতে আসে শুধুমাত্র ফসলের ভাগ বুঝে নিতে। আর ছোটছেলে সাজেদ আলী। দুই ছেলে দুই মেয়ের জনক। নিজেদের জমি চাষাবাদ করে। পরিশ্রমী, নিস্বার্থ।  একান্নবর্তী পরিবারটিকে টিকিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে সে।
বৃদ্ধ এন্তাজ আলীর একমাত্র মেয়ে ছালেহার বিয়ে হয়েছিলো মাইল আটেক পশ্চিমে দূরের ফুলেশ্বর গ্রামে। বিয়ের ১২ বছর পর স্বামী মারা যায়। শ্বশুরবাড়িতে টিকতে না পেরে দশ বছরের ছেলে টিপুকে নিয়ে বছর তিনেক আগে বাপের কাছে চলে আসে। সেই থেকে মা-ছেলে এই একান্নবর্তী সংসারের স্থায়ী সদস্য হয়ে যায়।
    
বৃদ্ধ এন্তাজ আলী থেমে থেমেই ‘খুক খুক’ করে কাশছেন আর বালিশের পাশে রাখা হুক্কাটা কিছুক্ষণ পর পরই ঠোঁটে ছোঁয়াচ্ছেন। 
‘দাদা, তোমাকে না হুক্কা খাইতে নিষেধ করছি! সারাক্ষণই তো কাশছো, এই ছাইপাঁশ না খাইলে হয় না?’ হুক্কাটা দেখিয়ে বললো মেজছেলের ঘরের নাতি মাসুম।
একগাল হেসে বৃদ্ধ বলে উঠলেন, ‘অভ্যাস হয়ে গ্যাছেরে ভাই। এখন আর ছাড়তে পারি না।’
‘অভ্যাস না ছাই! দাও, ওটা আমার কাছে দাও। কয়েকদিন না খাইলেই অভ্যাস বদলে যাবে।’ বৃদ্ধের হাত থেকে হুক্কাটা কেড়ে নিয়ে বললো মাসুম। যদিও সে জানে তার মা এটা খুঁজে এনে আবার শ্বশুরের হাতে তুলে দেবে। এ নিয়ে অনেকবারই একই কাণ্ড ঘটেছে। বৃদ্ধ নিজেও এটা জানেন। তাই মৃদু হেসে চুপ করে রইলো। ছালেহা বাবার কোঠায় উঁকি দিয়েই বুঝলো কী ঘটেছে। মুচকি হেসে সে ওখান থেকে বিদায় নিলো।

চলবে ......

প্রথম পর্ব পড়তে  এখানে  ক্লিক করুন। 

ছবি
সেকশনঃ সাহিত্য
লিখেছেনঃ নিভৃত স্বপ্নচারী তারিখঃ 25/06/2022
সর্বমোট 426 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ

সর্বোচ্চ মন্তব্যকৃত

এই তালিকায় একজন লেখকের সর্বোচ্চ ২ টি ও গত ৩ মাসের লেখা দেখানো হয়েছে। সব সময়ের সেরাগুলো দেখার জন্য এখানে ক্লিক করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

এই তালিকায় একজন লেখকের সর্বোচ্চ ২ টি ও গত ৩ মাসের লেখা দেখানো হয়েছে। সব সময়ের সেরাগুলো দেখার জন্য এখানে ক্লিক করুন